‘এখন রাস্তায় শুয়ে থাকা ছাড়া তো উপায় নেই’

আইনি লড়াইয়ে হেরে যাওয়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদের গুলশানের বাড়ির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কার্যক্রম আজ বুধবার বেলা দুইটার দিকে শুরু হয়েছে। তাঁর বাড়ির ভেতর থেকে মালামাল সরিয়ে বাইরে রাখা ট্রাকে তোলা হচ্ছে।

গুলশান-২-এর ১৫৯ নম্বরের একতলা বাড়িটিতে দীর্ঘদিন বসবাস মওদুদ আহমদের। দুপুরে বাড়িটির সামনে গিয়ে দেখা গেল, বাড়িটি ঘিরে কঠোর নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মোতায়েন করা হয়েছে পুলিশ। রাখা হয়েছে জলকামান, প্রিজনভ্যান, সাঁজোয়াযান ও বুলডোজার। এ ছাড়া মালামাল সরানোর জন্য আছে দুটি বড় ট্রাক। সেখানে উপস্থিত আছেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু বকর সিদ্দিক এসব তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদের গুলশানের বাড়ি থেকে মালামাল সরিয়ে নিচ্ছে রাজউক। ছবি: আশরাফুল আলম

বেলা পৌনে তিনটার দিকে বাসার ভেতর থেকে মালামাল নিয়ে শ্রমিকেরা রাজউকের ট্রাকে তুলছিলেন। এ সময় বিএনপির গণমাধ্যম শাখার সদস্য শায়রুল কবীর বলেন, ‘মালামাল এখান থেকে কোথায় নেওয়া হবে, জানি না।’

মওদুদ আহমদ গুলশানের যে বাড়িতে বাস করে আসছেন, সেই বাড়ির বিষয়ে সর্বোচ্চ আদালতের দেওয়া সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা চেয়ে করা আবেদন (রিভিউ) গত রোববার পর্যবেক্ষণসহ খারিজ করে দেন আপিল বিভাগ। আদেশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, বাড়ি অবশ্যই ছাড়তে হবে। বাড়িটা বর্তমানে নিয়ে নেওয়া সরকারের দায়িত্ব। এরপর আজ বাড়িটি নিয়ন্ত্রণে নিতে ঘটনাস্থলে যান রাজউকের কর্মকর্তারা।

বুধবার বাড়ির ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ। ছবি: আশরাফুল আলম

বাড়ির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কার্যক্রম শুরুর পর প্রথম আলোর পক্ষ থেকে মওদুদ আহমদকে ফোন করা হলে তিনি জানান, তিনি বনানীতে। নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো নোটিশ নেই। কোনো অর্ডার নেই। তারা বিদ্যুতের লাইন, গ্যাসের লাইন কেটে দিয়েছে। এখন শুনছি মালামালও তুলে নেবে। এটা সম্পূর্ণ অন্যায়, অবিচার। জোর করে যা ইচ্ছা মনে হয় তা-ই করা।’ এখন কী পদক্ষেপ নেবেন-এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘পেশিশক্তির সঙ্গে আমার কী করার আছে? এ মুহূর্তে আদালতে যাব সে উপায়ও নেই।’ এর সঙ্গে যোগ করেন, ‘উচ্ছেদ অভিযান না চালানোর আবেদন জানিয়ে গতকাল আমি একটি দেওয়ানি মামলা করেছিলাম। মামলা নম্বর ৫৬১। এই মামলায় আদালত রাজউককে একটি সমনও জারি করেছেন। এর মধ্যেই এই অভিযান চালানো হলো। এখন আমি কীই-বা করতে পারি!’

বেলা তিনটার একটু পরে আইনজীবীর পোশাকে গাড়িতে করে বাড়ির সামনে পৌঁছান মওদুদ আহমদ। বাড়ির প্রধান ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে উচ্ছেদ কর্মকাণ্ড পরিচালনাকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘দেশে যে আইনের শাসন নেই, এটি তারই প্রমাণ।’ পরে গণমাধ্যমকর্মীদের ডেকে বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘দেখেন, কীভাবে আমার মালামাল তুলে নিচ্ছে! এটা প্রতিহিংসার সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত। আদালত তো বলেননি এই বাড়ি থেকে উচ্ছেদের কথা। রাজউকও উচ্ছেদের নোটিশ দেয়নি। বিরোধী দলের রাজনীতি করি বলেই বাসা থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। সরকারি দলের নেতা হলে তো এমন হতো না।’ এখন কী করবেন-সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘এখন রাস্তায় শুয়ে থাকা ছাড়া তো উপায় নেই। মালামাল কোথায় নেওয়া হবে, তা জানি না।’

বাড়ি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার বিষয়ে রাজউকের পরিচালক ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট খন্দকার অলিউর রহমান বলেন, ‘আমরা বাড়িটি নিয়ন্ত্রণে নিতে এসেছি।’ মালামাল বাজেয়াপ্ত করা হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘না, বাজেয়াপ্ত করা হবে না। যার জিনিস তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে। আমরা শুধু দখলমুক্ত করব।’

পুলিশি পাহারায় বাড়ির মালামাল সরিয়ে নেয় রাজউক। ছবি: আশরাফুল আলম আধা ঘণ্টার মতো বাড়ির ভেতরে অবস্থান করে বেলা পৌনে পাঁচটার দিকে বাইরে বের হয়ে আসেন মওদুদ আহমদ। তিনি বলেন, ‘সম্পূর্ণ গায়ের জোরে, জোরপূর্বক আমাকে বাসা থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত রাজউক কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেনি। আদালতের নির্দেশ নেই।’ মালামাল কোথায় নেওয়া হচ্ছে—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের পাশে খালি একটা ফ্ল্যাট আছে (৫১ নম্বর সড়কের ২ নম্বর বাসা), সেখানে নিয়ে রাখা হচ্ছে। বাসার লাইব্রেরিতে হাজার হাজার বই, সব ছিন্নভিন্ন অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছে। আমরা অনুরোধ করেছিলাম, সময় দেন। আমরা সুন্দর করে নিয়ে যাব। দেয়নি।’

বাড়ির বাইরে দলীয় নেতা-কর্মীদের তেমন দেখা যায়নি কেন—জবাবে মওদুদ আহমদ বলেন, ‘আমি সবাইকে এখানে আসতে মানা করেছি। তারা এখানে আসতে চেয়েছিলেন। সবাই তো ভীত-শঙ্কিত। এলে না জানি আবার গ্রেপ্তার করে নেয়!’

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*