‘মসজিদে বায়ুত্যাগের অপরাধে পাকিস্তানি যুবকের মৃত্যুদণ্ড!’ভাইরাল খবরের নেপথ্যে কী ?

চিত্র- বিচিত্র ফিচার ডেস্ক- ‘পবিত্র রমজান মাসে  মসজিদে নামাযকালীন সময়ে ‘অতিরিক্ত বায়ুত্যাগের অপরাধে’ এক পাকিস্তানি যুবককে  মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে’ ! এমন নানা  শিরোনামে ভারতের মেইন স্ট্রিমের কয়েকটি পত্রিকায় খবর প্রকাশের পর ‘ই-গুজবে’  ভারী হয় এমন খবরের গল্প!

প্রকাশিত খবরে একজন পাকিস্তানের একজন আইন কর্মকর্তার উধৃতি দিয়ে বলা হয় যে যুবকের এমন ‘অপরাধের জন্য’  ব্লাসফেমি আইনের শাস্তি  দেয়া হয়েছে।

খবরে বলা হয়, ‘অতিরিক্ত বায়ু নির্গত করার কারণে তিনি সেখানকার স্থানীয়  ৬টি মসজিদ থেকে অন্তত ১৭ বার বহিষ্কৃত হয়েছিলেন! ‘

ইন্ডিয়া ডটকমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, মোহাম্মদ আল ওয়াহাবি নামে সেই ৩৩ বছর বয়সী যুবকের মারাত্মক পেট ফাঁপার সমস্যা রয়েছে বলে জানিয়েছিল  চিকিৎসকরা তারপরেও গত রমজান মাসে মসজিদে অতিরিক্ত বায়ু নির্গত করার অপরাধে সেই পাকিস্তানি যুবককে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়।’

ইন্ডিয়া ডটকমে এই সংবাদ প্রকাশিত হয় গত ১ জুন ২০১৭ তারিখে ।

মুলত এই সংবাদমাধ্যমের সুত্র ধরেই ছড়াতে থাকে এই খবরের ডালপালা।সেই খবরে রং চং লাগিয়ে প্রকাশ হয়েছে বাংলাদেশের বেশ কিছু ‘অনলাইন পত্রিকায়’ । একইসাথে প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশের একটি জাতীয় দৈনিকেও!

প্রকাশিত বিভিন্ন খবরগুলোতে পাকিস্তানি ডেপুটি ডিস্ট্রিক্ট পাবলিক প্রসিকিউটর সৈয়দ আনিস শাহ্‌ এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, ‘ অভিযুক্ত ব্যক্তি মারাত্মক ধর্ম অবমাননা করেছেন। তিনি একবার ৫৩ জন মুসল্লিকে মসজিদ ছাড়তে বাধ্য করেছেন। তার কঠোর বিচার হওয়া উচিত। রমজান মাসকে মুসলমানদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব হিসেবে উল্লেখ করেন বিচারক।’

একইসাথে এই আইন কর্মকর্তার উধৃতি দিয়ে বলা হয়, ‘তবে বিচারক শাস্তির ক্ষেত্রে নমনীয়তা দেখিয়েছেন! শিরোশ্ছেদ বা পাথর নিক্ষেপ করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মধ্যে যেকোনও একটাকে বাছাই করার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে সেই যুবককে। বিচারক মনে করেন শিরোশ্ছেদে শাস্তি কম কারণ সেখানে মৃত্যুবেদনা খুব কম সময়ের।’ !

প্রিয় পাঠক, এবার আসা যাক মুল কথায়। অনলাইনে খুব সহজেই ছড়িয়ে পড়ে গুজব। বেশিরভাগ মানুষ কোন বাছ বিচার না করেই ইন্টারনেটে কোন সংবাদ দেখামাত্রই তা বিশ্বাস করে ফেলেন! অবশ্য সংবাদগুলোর সত্যতা যাচাই করার মত সময় সুযোগ অনেক সময়ই থাকেনা আমাদের।

আর এই সুযোগেই বিভিন্ন সময়ে নিজ নিজ স্বার্থ চরিতাত্থ করতে বিভিন্ন গোত্র বা ব্যক্তিবিশেষ কতৃক এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ে সহজেই।

প্রকৃত পক্ষে পাকিস্তানের কোথাও এমন ঘটনা ঘটেনি । ইন্টারনেটে  তথ্য ঘাটলেই খুব সহজেই কোন ঘটনার সত্যতা যাচাই সম্ভব। পাকিস্তানি ডেপুটি ডিস্ট্রিক্ট পাবলিক প্রসিকিউটর সৈয়দ আনিস শাহ্‌এর উধৃতি দেয়া হলেও পুরো ঘটনাটিই মিথ্যাচার । প্রকৃত ঘটনা হলো এই প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে চলতি বছরে অভিযোগ উঠেছিলো খ্রিস্টানদের মুসলমান ধর্মে কনভার্ট করার। সেই বিষয়টি এখনও বিচারাধিন।

[Deputy District Public Prosecutor (DDPP) Syed Anees Shah] লিখে গুগলে সার্চ দিলেও দেখবেন এই ঘটনার সত্যতা।

গ্লোবাইজেশানের এই যুগে পাকিস্তানের ইসলামাবাদের প্রতিনিধি প্রয়োজন নেই ।  তথ্য উপাত্ত খুজে বের করার অনেক উপায় আছে। সময়ের কণ্ঠস্বর ইচ্ছাকৃতভাবে অথবা উদ্দেশ্যপ্রনোদিত ভাবে কোন গুজবের সংবাদ প্রকাশ করে কাউকে বিভ্রান্ত না করতে বদ্ধপরিকর।

ভুয়া এই সংবাদ যেভাবে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে  প্রকাশিত হয়ে ভাইরাল হয়েছে তা নিচে দেখানোর চেস্টা করছি নিচে ছবির স্ক্রীন শটে ।

 

গত ২৮ জুন এই গুজবের সংবাদ প্রথম প্রকাশিত হয় ওয়ার্ল্ড নিউজ ডেইলি রিপোর্ট কম নামের একটি ইংরেজি অনলাইন পত্রিকায়।

এরপর জুনের ৩০ তারিখে ওয়ার্ল্ড নিউজ এর বরাত দিয়ে প্রকাশিত হয় আরও বেশ কিছু বিদেশী অনলাইনে । তবে এর কোনটিই নির্ভরযোগ্য অথবা মেইন স্টিমের সংবাদ মাধ্যম নয়।

এরপর ১ জুলাই ২০১৭ এই খবর হিন্দি ভাষায় রুপান্তর করে দ্বিতীয়বার  প্রকাশ হয় ইন্ডিয়া ডটকমে ।

১ জুলাই একইদিনে এই খবরের বাংলা সংস্করন প্রকাশিত হয় ভারতীয় বাংলা পত্রিকা এইবেলাতে।

খবরটি এতদিন বাংলায় অনুবাদিত ছিলোনা । অপেক্ষা হয়তো এইটুকুরই ছিলো ! এইবেলায় প্রকাশিত খবর একদিন বাদেই  ২ জুন হুবুহু প্রকাশিত হয় জাতীয় পত্রিকা কালের কন্ঠের অনলাইনে ।

এরপরের গল্প সবারই জানা। কালের কন্ঠে প্রকাশিত সংবাদ এবার হুবুহু কপিপেস্ট করে এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশের  প্রায় অর্ধশতাধিক অনলাইন পত্রিকায়! গুগলে সার্চ দিলেই মিলবে বাহারি শিরোনামে এই সংবাদের প্রকাশভঙ্গী । ইতমধ্যে ইউটিবের রিপোর্টার জরিনাদের মত বেশ কিছু চ্যানেলেও প্রকাশিত হয়েছে ‘দেখুন ভিডিওসহ’ সংস্করন।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*